কথাই যখন অস্ত্র, অশ্লীলতাই তখন ছদ্মবেশহীন নীতি

ফন্ট সাইজ:
0Shares

২০২৬ সালের ৫ই এপ্রিল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প কূটনীতির পথ না ধরে, ব্যবহার করলেন কুরুচিপূর্ণ ভাষা। রাস্তার মারামারির ভাষায় সারা বিশ্বে প্রচারিত ইরানের প্রতি তাঁর বার্তাটি ছিল কারাগারের দেয়ালে আঁচড়ে লেখা হুমকির মতো:

“ওপেন দা ফাকিং স্ট্রেইট, ইউ ক্রেজি বাস্টার্ডস, অর ইউ উইল বি লিভিং ইন হেল”

সময়টা ছিল বিদঘুটে। বাক্যগঠন আরও খারাপ। শেষের অংশটি —“সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর”— নিঃসন্দেহে ধার করা ধার্মিকতায় মোড়ানো এক উপহাস। এটা শুধু মর্যাদাহানিকরই ছিল না, ছিল উস্কানিমূলক। ৯ দিন আগে, বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের এক সমাবেশে তিনি তাঁর আক্রমণের তীর এক মিত্রের দিকে ঘুরিয়েছিলেন। সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের কথা বলতে গিয়ে তিনি দম্ভভরে বলেছিলেন:

“হি ডিডন’ট থিংক হি উড বি কিসিং মাই এ্যাস!… বাট নাউ হি হ্যাস টু বি নাইস উইথ মি”

দুটি অপমান। একটি প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে, অন্যটি এক সহযোগীর দিকে। দুটিই একই ব্যক্তি, একই সুরে বলেছেন। উভয় কথাই এমন এক অঞ্চলে শোনা গেছে, যেখানে স্মৃতিশক্তি দীর্ঘস্থায়ী, অপমান একদম স্বাভাবিক বিষয় এবং অর্থই মর্যাদা। এভাবেই যুদ্ধের সূচনা সবসময় বোমা দিয়ে নয়, বরং এমন কথা দিয়ে, যার জবাব বোমা দিয়ে দেয়া অনিবার্য হয়ে পড়ে।

অপমানের মূল্য

আরব বিশ্বে সম্মান কোনো আলঙ্কারিক বিষয় নয়। এটি কাঠামোগত। প্রকাশ্যে কোনো নেতার কাছ থেকে তা কেড়ে নিলে, আপনি শুধু একজন ব্যক্তিকে বিব্রতই করেন নি, বরং একটি সম্পর্ক ধ্বংস করে দিলেন। ট্রাম্প তাই করেছেন মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে। তিনি তাকে এক প্রকার অপমান করেছেন। সৌদি-স্পনসর্ড একটি অনুষ্ঠান। সৌদি বিনিয়োগকারীদের সামনেই তিনি একটি সজ্ঞানেই বলে বসেন: “আপনি অংশীদার নন। আপনি একজন অধস্তন।”

রিয়াদ কিছুই বলেনি। বলার সামর্থ্য তাদের ছিলও না। বিশেষ করে ইরানের আশ্রয়ে ওয়াশিংটনের ওপর কৌশলগত নির্ভরতার কারণে-  রিয়াদ নীরব থেকেছে, ধৈর্যধারণ করেছে। কিন্তু এধরনের পরিস্থিতিতে নীরবতা সম্মতি নয়। এটি একটি বিলম্বিত আঘাত। অপমান জমা হতে থাকে। নীরবে। ধৈর্য ধরে। কিন্তু যখন এর প্রতিদান দেওয়া হয়, তা খুব কমই ভদ্রোচিত হয়।

একই সময়ে, ইরানের বিরুদ্ধে ইস্টারের তীব্র আক্রমণটিও সমান বেপরোয়া ছিল। এতে অপমানের সঙ্গে হুমকি এবং অশ্লীলতার সঙ্গে ধর্মীয় উপহাস মিশে গিয়েছিল। তেহরান বুঝতে পেরেছিল: রাষ্ট্রপতির নিজের কণ্ঠেই প্রচারিত কথাই প্রমাণ, যুক্তরাষ্ট্র একটি রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একজন উস্কানিদাতা হিসেবে কথা বলে। এর চেয়ে নাটকীয় শাসনব্যস্থা আর হতে পারেনা।

কান বিচ্ছিন্নের ঘটনা

ইতিহাসে এমন ঘটনা আগেও ঘটেছে। ১৭৩১ সালে, একজন স্প্যানিশ অফিসার ক্যারিবিয়ানে একটি ব্রিটিশ জাহাজে চড়ে কোনো চোরাচালানের পণ্য না পেয়ে এর ক্যাপ্টেন রবার্ট জেনকিন্সের কান কেটে ফেলেন। কথিত আছে, তিনি কানটি এই সতর্কবাণীসহ ফেরত দিয়েছিলেন: “আপনার রাজাকে বলুন, তারও একই পরিণতি হবে।”

সাত বছর পর, জেনকিন্স পার্লামেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে সেই কানটি পেশ করেন। এর ফলে তাৎক্ষণিক, তীব্র এক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। রাজনৈতিকভাবে সেটি ছিল এক সুবিধাজনক সুযোগ। এরপর শুরু হয় যুদ্ধ। তা প্রায় এক দশক ধরে চলে। হাজার হাজার মানুষ মারা যায়। কোনো কিছুরই সমাধান হয়নি। এটি ইতিহাসে এক অদ্ভুত ও রক্তাক্ত নামে পরিচয় লাভ করে: জেনকিন্সের কানের যুদ্ধ।

ইতিহাসের এ শিক্ষাটি যেমনি সরল তেমনি নির্মম। অপমান, তা হোক বাস্তবিক অথবা অতিরঞ্জিত, তাই পরিণত হতে পারে অস্ত্রে। অপমান প্রকাশ্য হলে, তা যারা করেছে তাদেরও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। নেতারা হয়তো ভান করতে পারেন। কিন্তু জনগণ তা করে না। তারা প্রতিশোধ চায়। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ওয়ালপোল বুঝতে পেরেছিলেন যে এই যুদ্ধ অপ্রয়োজনীয়। তিনি এর বিরুদ্ধে সতর্ক করেছিলেন। তাকে উপেক্ষা করা হয়েছিল। প্রতিটি যুগই বিশ্বাস করে যে তারা আগের যুগের চেয়ে বেশি জ্ঞানী। প্রতিটি যুগই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে।

পরিকল্পিত অপমান

জেনকিন্সের কানে পৌঁছানোটা যদি আকস্মিক হয়ে থাকে, তবে এমস ডিসপ্যাচ ছিল ইচ্ছাকৃত। ১৮৭০ সালে, অটো ভন বিসমার্ক একটি কূটনৈতিক টেলিগ্রাম সম্পাদনা করে একটি সাধারণ কথোপকথনকে একটি পরিকল্পিত অপমান হিসেবে উপস্থাপন করেন। জনরোষে কোণঠাসা হয়ে ফ্রান্স যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর ফল ছিল ভয়াবহ: ফরাসি সাম্রাজ্যের পতন এবং সেই ক্ষোভ মিশে গিয়েছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ধুলোয়। বিসমার্ক অপমানের শক্তি বুঝতেন। তিনি একে শল্যচিকিৎসার ছুরির মতো ব্যবহার করতেন।

ট্রাম্পের অস্পষ্ট কথাগুলো থেকেই তার হুমকি প্রকাশ পায়। এর পেছনে কোনো পরিকল্পনার প্রমাণ নেই, এই অপমানের আড়ালে কোনো কৌশলগত উদ্দেশ্যও স্পষ্ট নয়। এটি বিসমার্কের সেই সার্জিক্যাল ছুরিও নয়। বরং একে কাঁচভর্তি একটি ঘরে অন্ধের মতো চালানো একটি হাতুড়ির সাথে তুলনা করা যায়। তবুও এর পরিণতি হয়তো আগের চেয়ে কম গুরুতর হবে না।

মেরামতের দায়

অপমানের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা যুদ্ধ সহজে শেষ হয় না। সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং পচন ধরায়। সেগুলো ভবিষ্যতের আলোচনাকে বিষিয়ে তোলে। সেগুলোই হয়ে ওঠে অভিযোগের ভাষা।

সৌদি আরব কোনো প্রান্তিক রাষ্ট্র নয়। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা এবং এই অঞ্চলকে একত্রিত করে রাখা ভঙ্গুর কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। প্রকাশ্যে এর নেতৃত্বকে হেয় করা মানে ভেতর থেকে সেই কাঠামোকে দুর্বল করে দেওয়া।

অন্যদিকে, ইরানের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রকে আগ্রাসী হিসেবে দেখছেন। যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একই সাথে অশ্লীল ভাষা, হুমকি এবং ধর্মীয় উপহাস করেন, তখন তিনি ভয় দেখান না, বরং তিনি বিষয়টিকে নিশ্চিত করেন এবং ক্ষুব্ধ করেন।

এরকম শব্দ কট্টরপন্থীদের আরও শক্তিশালী করে তোলে। প্রতিটি অপমান কূটনীতির পরিসর সংকুচিত করে। প্রতিটি ক্ষোভের প্রকাশ উভয় পক্ষের জন্যই ভবিষ্যতে আবার এক টেবিলে বসার রাজনৈতিক মূল্য বাড়িয়ে দেয়। তবুও, একদিন তাদের একে অপরের মুখোমুখি, চোখে চোখ রেখে বসতেই হবে।

নীরবে বিশৃঙ্খলা মেটাচ্ছেন যারা

যুদ্ধ যারা শুরু করে তাদের দ্বারা শেষ হয় না । যুদ্ধ শেষ হয় তাদের দ্বারা, যাদেরকে এর পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দিতে হয়: কূটনীতিক, মধ্যস্থতাকারী, ওমান, জেনেভা বা ইসলামাবাদের নামহীন কক্ষে বসে থাকা আলোচকেরা। তারা নীরবে কাজ করেন, যা ভেঙে গিয়েছিল তা মেরামত করেন। যেখানে বিশ্বাস নেই, সেখানে তাদের বিশ্বাস পুনর্নির্মাণ করতে হয়। ক্রোধকে ভাষায় রূপান্তর করতে হয়। অপমানকে সমঝোতায় পরিণত করতে হয়। নেতার বলা প্রতিটি কুরুচিপূর্ণ বাক্য তাদের জন্য একটি বাধা হয়ে দাঁড়ায়, যা তাদের শব্দে শব্দে ভেঙে ফেলতে হয়। ইতিহাস তাদের নাম মনে রাখে না। মনে রাখে যুদ্ধগুলোকে। তাদের ছাড়া, কোনো যুদ্ধই শেষ হতো না।

অবশ্যম্ভাবী হিসাবনিকাশ

একটি কাটা কান নয় বছর ধরে চলা এক যুদ্ধের সূত্রপাত করেছিল। একটি বিকৃত টেলিগ্রাম প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ইউরোপকে নতুন রূপ দিয়েছিল। এখন, ২০২৬ সালে, আমাদের বলা হচ্ছে যে অশ্লীলতা নিরীহ। এটাই অপমানের ধরন। ক্ষমতা এভাবেই কথা বলে। কিন্তু তা নয়। এভাবেই ক্ষমতা আবেগের কাছে ভেঙে পড়ে। প্রশ্নটা আর এটা নয় যে, কথার কোনো মূল্য আছে কি না। আছে। সবসময়ই ছিল। প্রশ্ন হলো, এরপর যে যুদ্ধ হবে তাকে আমরা কী নামে ডাকব এবং ওয়াশিংটনের কোথাও কেউ কি এখনো বোঝে যে, “না ভেবে কথা বলার পরিণাম কী?” কারণ রাজনীতিবিদদের মতো নয়, ইতিহাস একটি নির্ভুল হিসাব রাখে। আর যারা যুদ্ধের এই কোলাহলকে শক্তি ভেবে ভুল করে, ইতিহাস তাদের প্রতি কখনোই সদয় হয় না।

মিডেল ইস্ট মনিটর থেকে জসিম আল-আজ্জাওয়ি

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।