মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সংঘাত তীব্র হওয়ায় বিশ্ব খাদ্যবাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন বিশ্লেষকেরা। তাঁদের মতে, এই সংঘাত সার সরবরাহ, কৃষি উৎপাদন এবং খাদ্যের দামে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট Strait of Hormuz দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা ইতিমধ্যেই তেলের দাম দ্রুত বাড়িয়ে দিয়েছে। এই প্রণালী দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং বিপুল পরিমাণ তেল পরিবহন হয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু জ্বালানিই নয় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে সার রপ্তানি, মধ্যপ্রাচ্যে খাদ্য আমদানি এবং বৈশ্বিক কৃষি সরবরাহ শৃঙ্খলেও বড় চাপ তৈরি হতে পারে। সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম আরও বেড়ে যেতে পারে।
সার সরবরাহে বড় ধাক্কার আশঙ্কা
উপসাগরীয় অঞ্চল বিশ্বে সার উৎপাদন ও রপ্তানির অন্যতম কেন্দ্র। Iran, Qatar, Saudi Arabia, United Arab Emirates এবং Bahrain এই দেশগুলোর সার রপ্তানি মূলত হরমুজ প্রণালীর ওপর নির্ভরশীল।
International Fertilizer Association-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে এই পাঁচ দেশ মিলে বিশ্বে অ্যামোনিয়া বাণিজ্যের ২৩ শতাংশ এবং ইউরিয়া বাণিজ্যের ৩৪ শতাংশ সরবরাহ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চল ২০২৪ সালে বিশ্বে নাইট্রোজেন, ফসফেট ও পটাশসহ প্রধান সারের প্রায় ৩০ শতাংশ রপ্তানি সরবরাহ করেছে। একই সময়ে বিশ্ব ইউরিয়া বাণিজ্যের প্রায় অর্ধেকই এসেছে এই অঞ্চল থেকে।
বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান Kpler-এর ২০২৫ সালের এক বিশ্লেষণে বলা হয়, হরমুজ প্রণালী বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক সার সরবরাহে প্রায় ৩৩ শতাংশ ঘাটতি তৈরি হতে পারে। এতে সালফার সরবরাহ ৪৪ শতাংশ এবং ইউরিয়া ৩০ শতাংশ কমে যেতে পারে।
খাদ্য উৎপাদনে ‘ডমিনো প্রভাব’
International Food Policy Research Institute-এর গবেষক জোসেফ গ্লাউবার বলেন,
উপসাগরীয় অঞ্চল শুধু সার রপ্তানিই নয়, এলএনজিরও বড় উৎস যা সার উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
তিনি বলেন, “প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে প্রধান সারগুলোও চাপে পড়বে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্রাজিল, যুক্তরাষ্ট্র, থাইল্যান্ড ও ভারতের মতো বড় আমদানিকারক দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে।
ভুট্টা, গম ও ধানের মতো প্রধান খাদ্যশস্য উৎপাদনে সার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সার সরবরাহ কমে গেলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
California Polytechnic State University-এর কৃষি অর্থনীতিবিদ রিচার্ড ভলপি বলেন,
“উচ্চমানের সার নিয়মিত না পেলে ফলন কমে যাবে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে আন্তর্জাতিক কৃষিপণ্য বাণিজ্য ও খাদ্যের দামের ওপর।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, এতে ভবিষ্যৎ মৌসুমেও প্রভাব পড়তে পারে এবং দীর্ঘ সময় ধরে এক ধরনের “ডমিনো প্রভাব” তৈরি হতে পারে।
আমদানি ও মূল্যস্ফীতির চাপ
সংঘাতের কারণে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনে বিলম্ব এবং বন্দরে জটও তৈরি হতে পারে। এতে খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ভলপি বলেন, এর প্রথম প্রভাব দেখা যেতে পারে জাহাজের অপেক্ষার সময় বেড়ে যাওয়া ও বিকল্প বাণিজ্য পথ ব্যবহারের কারণে। তিনি আরও বলেন, চলতি মৌসুমে প্রভাব খুব বেশি না পড়লেও পরবর্তী মৌসুমে সার সংকট বড় সমস্যা হয়ে উঠতে পারে। গ্লাউবারের মতে, সংঘাত দীর্ঘ হলে কৃষকেরা সার কম ব্যবহার করতে পারেন অথবা কম সার লাগে এমন ফসলের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে জ্বালানি বাজারে।
ভলপি বলেন, “জ্বালানির দাম বাড়া পুরো খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় বহুগুণ প্রভাব ফেলে।”
সংঘাত দ্রুত শেষ হলেও এক-দুই মাসের মধ্যে খাদ্যের দাম বাড়তে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাজার কি মানিয়ে নিতে পারবে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপরই নির্ভর করবে বৈশ্বিক খাদ্য ব্যবস্থায় এর প্রভাব কতটা গভীর হবে।
ভলপি বলেন, “সংঘাত যত দীর্ঘ হবে, বিশ্বজুড়ে খাদ্যের দাম ও সরবরাহে তার প্রভাবও তত দীর্ঘস্থায়ী হবে।”
Rice University Baker Institute-এর জ্বালানি গবেষক কেনেথ মেডলক বলেন, কৃষি বাজারকে বিকল্প সরবরাহ উৎস খুঁজতে হবে, যা স্বল্প সময়ে সহজে পাওয়া যায় না। তবে তিনি মনে করেন, বৈশ্বিক কৃষি ব্যবস্থা শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে যদিও তাতে ব্যয় বাড়বে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।