মিথেন একটি অদৃশ্য গ্যাস হলেও পৃথিবীর জলবায়ুর ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত ভয়াবহ।
ল্যান্ডফিল, কৃষিখামার, কয়লাখনি ও পয়ঃশোধনাগার থেকে প্রতিনিয়ত এই গ্যাস বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে।
বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পর মিথেন কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় অনেক দ্রুত তাপ ধরে রাখে।
ফলে স্বল্প সময়েই জলবায়ু পরিবর্তন তীব্র আকার ধারণ করে।
তবে বিজ্ঞানীরা এখন একটি প্রাকৃতিক সমাধানের সন্ধান পেয়েছেন।
প্রকৃতিতে থাকা কিছু বিশেষ ব্যাকটেরিয়া মিথেনকে খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে এবং এটিকে দূষণের বদলে উপকারী উপাদানে রূপান্তর করতে পারে।
এই অণুজীবগুলো প্রকৃতিতেই বিদ্যমান। সঠিক পরিবেশ তৈরি করা গেলে, ভারী যন্ত্রপাতি বা রাসায়নিক ব্যবহার ছাড়াই মানবসৃষ্ট ব্যবস্থায় এগুলো দিয়ে ক্ষতিকর নিঃসরণ কমানো সম্ভব।
মিথেন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা
মিথেন অল্প পরিমাণেও শক্তিশালী উষ্ণায়ন ঘটায়। গবেষণা অনুযায়ী, ১০০ বছরের হিসেবে এক একক মিথেন পৃথিবীকে কার্বন ডাই-অক্সাইডের তুলনায় প্রায় ২৮ গুণ বেশি উষ্ণ করে।
কম অক্সিজেনযুক্ত পরিবেশ যেমন জলাভূমি, ধানক্ষেত, গোবরের গর্ত, ল্যান্ডফিল ও পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থায় মিথেন উৎপাদন সবচেয়ে বেশি হয়।
এসব স্থানেই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠে মিথেন-ভোজী ব্যাকটেরিয়া। তারা বাতাসে ছড়িয়ে পড়ার আগেই মিথেন শোষণ করে নেয়।
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রকৃতিতে উৎপন্ন জৈব মিথেনের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যে এই অণুজীবের মাধ্যমেই অপসারিত হয়। এই প্রক্রিয়াকে জোরদার করা গেলে প্রকৃতিনির্ভর সমাধানের মাধ্যমে বৈশ্বিক উষ্ণতা কমানো সম্ভব।
কীভাবে ব্যাকটেরিয়া মিথেন ভাঙে
মিথেন-খেকো ব্যাকটেরিয়াকে বলা হয় মিথেনোট্রফ। তারা মিথেনকে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করে।
এই প্রক্রিয়ায় প্রথমে মিথেন রূপান্তরিত হয় মিথানলে। এরপর ধাপে ধাপে তা ফর্মালডিহাইড, ফরমেট এবং শেষ পর্যন্ত কার্বন ডাই-অক্সাইডে পরিণত হয়।
এই রূপান্তর প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন শক্তিই ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি ও উপাদান উৎপাদনে সহায়তা করে।
এখানে দুটি প্রধান এনজাইম ব্যবস্থা কাজ করে। একটি তামা নির্ভর এবং কোষঝিল্লির ভেতরে সক্রিয় থাকে। অন্যটি লোহা নির্ভর এবং কোষের অভ্যন্তরে কাজ করে।
পরিবেশে তামার উপস্থিতি অনুযায়ী কোন ব্যবস্থা সক্রিয় থাকবে তা নির্ধারিত হয় ফলে বিভিন্ন পরিবেশে এই অণুজীব সহজেই মানিয়ে নিতে পারে।
মিথেনোট্রফের বিভিন্ন ধরন
বিজ্ঞানীরা বায়ুবাহিত মিথেনোট্রফকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন
টাইপ I, টাইপ II ও টাইপ X।
টাইপ I দ্রুত বর্ধনশীল এবং কোষীয় প্রোটিন উৎপাদনে কার্যকর
টাইপ II কার্বন সঞ্চয়ে দক্ষ, যা প্লাস্টিক উৎপাদনে উপযোগী
টাইপ X উচ্চ তাপমাত্রা ও অম্লীয় পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম
এই বৈচিত্র্য গবেষকদের নির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী উপযুক্ত অণুজীব বেছে নিতে সহায়তা করে।
কোথায় মিথেন কমাচ্ছে এই ব্যাকটেরিয়া
বর্তমানে বিভিন্ন স্থানে প্রকৌশলগতভাবে মিথেনোট্রফ ব্যবহার করা হচ্ছে।
ল্যান্ডফিলে মাটিভিত্তিক বায়ো-কভার ব্যবস্থায় এই ব্যাকটেরিয়া বাতাসে যাওয়ার আগেই মিথেন শোষণ করে।
বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট ও কয়লাখনির গ্যাস পরিশোধনে ব্যবহৃত হচ্ছে বায়োফিল্টার।
কিছু খনিতে বিস্ফোরণের ঝুঁকি কমাতে মিথেন-অক্সিডাইজিং ব্যাকটেরিয়া মিশ্রিত পানির কুয়াশা ছিটানো হয়।
পয়ঃশোধনাগারেও এই অণুজীব দ্রবীভূত মিথেন ও নাইট্রোজেন দূষণ কমাতে সহায়তা করে একই সঙ্গে বায়ু ও পানির মান উন্নত হয়।
অন্যান্য গ্রিনহাউস গ্যাসের ঝুঁকি
শুধু মিথেন অপসারণই সব সমস্যার সমাধান নয়। কিছু ক্ষেত্রে অণুজীবীয় প্রক্রিয়ায় নাইট্রাস অক্সাইড নির্গমন বেড়ে যেতে পারে, যা আরও শক্তিশালী গ্রিনহাউস গ্যাস।
তামার জন্য অণুজীবের প্রতিযোগিতা নাইট্রোজেন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।
তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় এমন নিরাপদ প্রজাতি চিহ্নিত হয়েছে, যেগুলো নাইট্রাস অক্সাইডকে ক্ষতিহীন নাইট্রোজেনে রূপান্তর করতে সক্ষম।
শানডং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক জিংরুই দেং বলেন,
“ভবিষ্যতের ব্যবস্থাপনায় এমন অণুজীব নির্বাচন জরুরি, যাতে আমরা এক গ্যাস কমিয়ে আরেকটি বাড়িয়ে না ফেলি।”
মিথেন থেকে উপকারী পণ্য
মিথেনোট্রফ দিয়ে উৎপাদন করা যায় মিথানল, যা জ্বালানি ও শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল।
এ ছাড়া মিথেনভিত্তিক সিঙ্গেল-সেল প্রোটিন তৈরি করা সম্ভব, যা প্রাণিখাদ্য হিসেবে অত্যন্ত পুষ্টিকর।
মিশ্র অণুজীব ব্যবস্থায় উৎপাদন আরও কার্যকর হয়। এক অণুজীবের উৎপন্ন মধ্যবর্তী পদার্থ অন্যটি ব্যবহার করে, ফলে বিষাক্ত জমাট বাঁধে না।
মিথেন দিয়ে প্লাস্টিক উৎপাদন
কিছু মিথেনোট্রফ কোষের ভেতরে পলিহাইড্রোক্সিআলকানোয়েট (PHA) জমা করে, যা বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক হিসেবে ব্যবহৃত হয়।বিশেষ করে টাইপ II প্রজাতি, যেমন মিথাইলোসিস্টিস, নাইট্রোজেন সীমিত থাকলে এবং মিথেন বেশি হলে সবচেয়ে ভালো ফল দেয়।সঠিক নিয়ন্ত্রণে কোষের মোট ভরের অর্ধেকের বেশি প্লাস্টিক হতে পারে।
ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা
প্রতিটি পণ্যের জন্য আলাদা কৌশল দরকার। কোথাও মিথানল, কোথাও প্রোটিন, কোথাও প্লাস্টিক সবক্ষেত্রে পুষ্টি, তাপমাত্রা ও গ্যাসের ভারসাম্য গুরুত্বপূর্ণ।
রামান-ভিত্তিক বাছাই ও সিনথেটিক বায়োলজি নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
গবেষক কিগুই নিয়ু বলেন,
“মিথেনোট্রফ এখন জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও সবুজ শিল্পের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে। সঠিক প্রযুক্তি প্রয়োগ করলে মিথেন আর সমস্যা নয়, বরং টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি হতে পারে।”
সাঞ্জনা গাজভিয়্যে
আর্থ.ডটকম-এর বিজ্ঞান প্রতিবেদক
আপনার মোবাইল দিয়ে এই QR কোডটি স্ক্যান করে বিস্তারিত খবরটি অনলাইনে পড়ুন।
https://bdexpress.news/methane-eating-microbes/© বিডিএক্সপ্রেস | bdexpress.news | খবর, সর্বশেষ খবর, ব্রেকিং নিউজ, বিডিনিউজ, বাংলা নিউজ | News, latest news, breaking news | প্রিন্ট/ডাউনলোড: ২৯-০৪-২০২৬, ০৪:২৮ অপরাহ্ণ